২৯ বছরে গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থা

ভোলার কথা
নিউজ ডেস্ক সম্পাদক
প্রকাশিত: ১০:৫৬ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১, ২০২৬

নিউজ ডেস্কঃ

আজ গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থা পদার্পণ করলো ২৯ বছরে। ১৯৯৭ সালের ১ জানুয়ারি ভোলা সদর উপজেলার চরনোয়াবাদের একটি জরাজীর্ণ ছোট বৈঠকখানা থেকে নীরবে যাত্রা শুরু করেছিল গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থা (জিজেইউএস)। প্রান্তিক মানুষের জীবনমান উন্নয়নের স্বপ্ন নিয়ে তরুণ সমাজকর্মী জাকির হোসেন মহিন তখন একটি সাইকেলই সম্বল করে গ্রামবাংলার ধুলো-মাখা মেঠোপথে ছুটে বেড়িয়েছেন। সঙ্গে ছিলেন আরও দুই তরুণ সহযোগী। মানুষের কষ্ট, দারিদ্র্য ও বঞ্চনার বাস্তবতা কাছ থেকে উপলব্ধি করে তিনি বুঝেছিলেন কেবল সহায়তা দিলেই হবে না; মানুষের ভেতরের শক্তিকে জাগিয়ে তুলতে না পারলে টেকসই পরিবর্তন সম্ভব নয়। সেই উদ্যোগ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একটি প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়। ঘামে ভেজা শরীর আর দিন-রাতের অক্লান্ত পরিশ্রমে শুরু হওয়া ক্ষুদ্র পরিসরের কার্যক্রম থেকে ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়ে গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থা (জিজেইউএস) আজ ভোলার গন্ডি পেরিয়ে বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা ও নোয়াখালীসহ ৫টি জেলায় কার্যক্রম পরিচালনা করছে। যে সংস্থাটি শুরু হয়েছিল মাত্র ৩ জন মানুষ নিয়ে, বর্তমানে সেখানে সহ¯্রাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর কর্মসংস্থান হয়েছে।

জানা গেছে, ঋণ কার্যক্রমের পাশাপাশি দারিদ্র্য বিমোচন, কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য উন্নয়ন, নারী ক্ষমতায়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, আইনি সহায়তা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বহুমুখী উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ত জমিতে ফসল ফলানো, শূন্য খামারে প্রাণ ফিরিয়ে আনা কিংবা জেলে পরিবারের ছেঁড়া জালে নতুন আশার স্বপ্ন বোনা-এমন বহু বাস্তব পরিবর্তনের গল্প জিজেইউএস-এর কার্যক্রমে জড়িয়ে আছে।

ভোলা সদর উপজেলার ইলিশা এলাকার সদস্য মো: জামাল বলেন, আগে দিনে ৫০ টাকাও আয় করতে পারতাম না। জিজেইউএস-এর ঋণ নিয়ে একটি দোকান দিয়েছি। এখন মাসে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা আয় হচ্ছে। ৪ মেয়েকে নিয়ে আমার পরিবার এখন ভালোভাবে জীবন-যাপন করছে।

সদর উপজেলার সদুরচর এলাকার কৃষক মো: মনির বলেন, জিজেইউএস-এর পরামর্শ ও ঋণ নিয়ে সর্জান পদ্ধতিতে সবজি চাষ করে আগের চেয়ে বহু গুণ বেশি লাভ হচ্ছে। চলতি বছরে তিনি লক্ষাধিক টাকার সবজি বিক্রি করেছেন।

পটুয়াখালীর চর মোন্তাজ এলাকার উপকারভোগী লাভলী বেগম বলেন, আগে একবেলা খেলে আরেক বেলার চিন্তা করতে হতো। কিন্তু জিজেইউএস-এর সহায়তায় সবজি চাষ, হাঁস-মুরগি ও গরু-ছাগল পালন শুরু করে আজ নিজের পায়ে দাঁড়াতে পেরেছি এবং সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে পারছি। আমার এক ছেলে বর্তমানে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে, আর মেয়ে এসএসসি পাস করেছে।

এমন অভিজ্ঞতা শুধু কয়েকজনের নয়; উপকূলজুড়ে অসংখ্য পরিবারের জীবনে পরিবর্তনের গল্প তৈরি করেছে জিজেইউএস। এই কার্যক্রম বাস্তবায়নে জিজেইউএস পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ), ইউএনডিপি, সিমিট, বিশ্বব্যাংক, এনজিও ফোরাম, গণসাক্ষরতা অভিযান, ব্র্যাক, ইরি, সিডিডি, ডব্লিউএফপি, আইএফএডি, সেভ দ্য চিলড্রেন, গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং সরকারি প্রকল্পের সঙ্গে অংশীদারিত্বে কাজ করে যাচ্ছে। এসব অংশীদারিত্ব প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

যুবসমাজকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরের লক্ষ্যে ভোলার ব্যাংকের হাট এলাকায় একটি অত্যাধুনিক জন উন্নয়ন টেকনিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট স্থাপন করেছে জিজেইউএস। এখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে শত শত তরুণ-তরুণী বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছেন।

ভোলা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: আরিফুজ্জামান বলেন, সরকারের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে জিজেইউএস একটি গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী হিসেবে কাজ করছে। বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় তাদের ভূমিকা প্রশংসনীয়।

জেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা মো: রফিকুল ইসলাম খান বলেন, জিজেইউএস দীর্ঘদিন ধরে প্রাণি সম্পদ খাতে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে আসছে। বেকার যুবকদের প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র খামারিদের অনুদান ও উদ্যোক্তা তৈরিতে তাদের ভূমিকা অসামান্য।

ভোলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো: খাইরুল ইসলাম মল্লিক জানান, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণি সম্পদ খাতে জিজেইউএস-এর সহযোগিতায় ভোলা অনেক সমৃদ্ধ হয়েছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ভোলার কৃষি আরও অনেক দূর এগিয়ে যাবে।

দীর্ঘ পথচলার স্বীকৃতি হিসেবে জিজেইউএস বিভিন্ন সময়ে জাতীয়ভাবে সরকারি ও বেসরকারি সম্মাননা অর্জন করেছে। এর মধ্যে ‘সেরা যুব সংগঠক’ পুরস্কার, ২০১৯ সালে চ্যানেল আই এগ্রো অ্যাওয়ার্ড এবং ২০২৩ সালে প্রাণি সম্পদ অধিদপ্তরের ডেইরি আইকন অ্যাওয়ার্ডসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা রয়েছে।

 

সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসেন মহিন বলেন, আমাদের মূল লক্ষ্য সততা ও ঐতিহ্যকে ধারণ করে মানুষের জীবনমান উন্নয়নকে এগিয়ে নেওয়া। সরকারের সহযোগী হিসেবে সাধারণ মানুষের পাশে থেকে জীবন-যাত্রার পরিবর্তনের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে জিজেইউএস। আমাদের সেবাকে আরও তৃণমূলে পৌঁছে দিতে চাই। ভোলায় একটি আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণ করে জেলার স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনাই আমাদের লক্ষ্য। একই সঙ্গে ভোলার কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে দেশে-বিদেশে তুলে ধরে জেলার পর্যটন খাতকে সমৃদ্ধ করতেও আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের স্বপ্ন-এই অঞ্চলের প্রতিটি মানুষ যেন আত্মমর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারে।